০৯:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ২৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিবচর হানাদারমুক্ত দিবস আজ

শিবচর হানাদারমুক্ত দিবস আজ

এস এম আলমগীর হুসাইন
স্টাফ রিপোর্টার
শিবচর, মাদারিপুর

২৫ নভেম্বর শিবচরের ইতিহাসে শুধু একটি তারিখ নয়—এটি শোষণ, নির্যাতন আর ভয়কে ভেঙে দাঁড়িয়ে ওঠার দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ লড়াই করে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে শহীদ হন শিবচরের আব্দুর সালাম, ভাঙ্গার কমান্ডার মোশাররফ হোসেন, সদরপুরের কমান্ডার দেলোয়ার হোসেন এবং মাত্র ১১ বছরের শিশু যোদ্ধা মাজেদ। অপরদিকে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার মিলিয়ে ১৮ জন নিহত হয়।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস থেকেই শিবচরের মানুষ দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছিল। স্থানীয়রা জানান, মে মাসে পাক বাহিনী রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে দুই দফায় তাণ্ডব চালায়—শহীদ হন কমপক্ষে ৩০ জন নিরীহ মানুষ। অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হন। দোকান-পাট ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সন্ত্রাস চালিয়ে তারা থানায় স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলে।

সেপ্টেম্বরে মুক্তিযোদ্ধারা শিবচর বাজারের পাক ক্যাম্পে হঠাৎ আক্রমণ চালালে শত্রুপক্ষ বুঝে যায় তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এরপর তারা আরও নির্মম হয়ে ওঠে। গ্রামে গ্রামে তল্লাশি, ধরে নিয়ে যাওয়া, খুন—সবই ছিল প্রতিদিনকার ভয়।

অপারেশনের আগে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি টিম শিবচরের চারপাশে অবস্থান নেয়। স্থানীয় গাইডরা থানা ভবনের ভেতরের কাঠামো, রুট, প্রহরার সময়—সব তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দেয়।

অনেক সাধারণ মানুষও গোপনে সাহায্য করছিলেন। কেউ খাবার পাঠিয়েছেন, কেউ রাস্তা দেখিয়েছেন, কেউ আবার নিজেদের ঘরকে অস্থায়ী আশ্রয় বানিয়ে দিয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ছিল বেশিরভাগই স্টেনগান, রাইফেল আর সীমিতসংখ্যক এলএমজি। বিপরীতে পাক বাহিনীর ছিল আধুনিক অস্ত্র, বড় ঘাঁটি এবং গোলাবারুদের মজুত। তারপরও মনোবল আর প্রস্তুতিতে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে ছিলেন।

২৪ নভেম্বর রাত তিনটার দিকে শিবচর, ভাঙ্গা ও সদরপুরের প্রায় ১৭৫ জন মুক্তিযোদ্ধা একযোগে তিন দিক থেকে থানাকে ঘিরে ফেলেন। প্রথম বিস্ফোরণেই পাকিস্তানি বাহিনী বুঝে যায় তাদের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ নেমে এসেছে।

অভিযানটি নেতৃত্ব দেন স্থানীয় অভিজ্ঞ যোদ্ধারা। শিশু মাজেদ বয়সে ছোট হলেও নিয়মিত বার্তা বহন, গুলি সরবরাহ ও আহতদের সাহায্যে সামনে থেকে কাজ করছিল।

সকালে গুলি চালাচালি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধারা এক দফায় থানা ভবনের সামনের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন। বিকেল গড়াতেই পাক বাহিনীর গোলাবারুদ কমে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা সেই সুযোগে সামনে এগিয়ে যায়।

শিবচর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহ নেওয়াজ তোতা স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, “লড়াইটা ছিল বুকের সাহসের লড়াই। আমরা সংখ্যা কম ছিলাম না, কিন্তু ওদের অস্ত্র আধুনিক। তারপরও সবাই জানত—আজ এখানকার মাটি মুক্ত করতেই হবে।”

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পাক বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। থানার ওপরে উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা।
এই যুদ্ধের বড় বেদনাটি হলো চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ—যার একজন মাত্র এগারো বছরের শিশু। তাদের রক্তে মুক্ত হয় শিবচর। এই অপারেশনকে অনেক ইতিহাস গবেষক শিবচর অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

হোমনার নিলখী সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়াকে গণসংবর্ধনা

শিবচর হানাদারমুক্ত দিবস আজ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:০৩:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫

শিবচর হানাদারমুক্ত দিবস আজ

এস এম আলমগীর হুসাইন
স্টাফ রিপোর্টার
শিবচর, মাদারিপুর

২৫ নভেম্বর শিবচরের ইতিহাসে শুধু একটি তারিখ নয়—এটি শোষণ, নির্যাতন আর ভয়কে ভেঙে দাঁড়িয়ে ওঠার দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ লড়াই করে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে শহীদ হন শিবচরের আব্দুর সালাম, ভাঙ্গার কমান্ডার মোশাররফ হোসেন, সদরপুরের কমান্ডার দেলোয়ার হোসেন এবং মাত্র ১১ বছরের শিশু যোদ্ধা মাজেদ। অপরদিকে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার মিলিয়ে ১৮ জন নিহত হয়।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস থেকেই শিবচরের মানুষ দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছিল। স্থানীয়রা জানান, মে মাসে পাক বাহিনী রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে দুই দফায় তাণ্ডব চালায়—শহীদ হন কমপক্ষে ৩০ জন নিরীহ মানুষ। অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হন। দোকান-পাট ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সন্ত্রাস চালিয়ে তারা থানায় স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলে।

সেপ্টেম্বরে মুক্তিযোদ্ধারা শিবচর বাজারের পাক ক্যাম্পে হঠাৎ আক্রমণ চালালে শত্রুপক্ষ বুঝে যায় তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এরপর তারা আরও নির্মম হয়ে ওঠে। গ্রামে গ্রামে তল্লাশি, ধরে নিয়ে যাওয়া, খুন—সবই ছিল প্রতিদিনকার ভয়।

অপারেশনের আগে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি টিম শিবচরের চারপাশে অবস্থান নেয়। স্থানীয় গাইডরা থানা ভবনের ভেতরের কাঠামো, রুট, প্রহরার সময়—সব তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দেয়।

অনেক সাধারণ মানুষও গোপনে সাহায্য করছিলেন। কেউ খাবার পাঠিয়েছেন, কেউ রাস্তা দেখিয়েছেন, কেউ আবার নিজেদের ঘরকে অস্থায়ী আশ্রয় বানিয়ে দিয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ছিল বেশিরভাগই স্টেনগান, রাইফেল আর সীমিতসংখ্যক এলএমজি। বিপরীতে পাক বাহিনীর ছিল আধুনিক অস্ত্র, বড় ঘাঁটি এবং গোলাবারুদের মজুত। তারপরও মনোবল আর প্রস্তুতিতে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে ছিলেন।

২৪ নভেম্বর রাত তিনটার দিকে শিবচর, ভাঙ্গা ও সদরপুরের প্রায় ১৭৫ জন মুক্তিযোদ্ধা একযোগে তিন দিক থেকে থানাকে ঘিরে ফেলেন। প্রথম বিস্ফোরণেই পাকিস্তানি বাহিনী বুঝে যায় তাদের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ নেমে এসেছে।

অভিযানটি নেতৃত্ব দেন স্থানীয় অভিজ্ঞ যোদ্ধারা। শিশু মাজেদ বয়সে ছোট হলেও নিয়মিত বার্তা বহন, গুলি সরবরাহ ও আহতদের সাহায্যে সামনে থেকে কাজ করছিল।

সকালে গুলি চালাচালি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধারা এক দফায় থানা ভবনের সামনের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন। বিকেল গড়াতেই পাক বাহিনীর গোলাবারুদ কমে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা সেই সুযোগে সামনে এগিয়ে যায়।

শিবচর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহ নেওয়াজ তোতা স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, “লড়াইটা ছিল বুকের সাহসের লড়াই। আমরা সংখ্যা কম ছিলাম না, কিন্তু ওদের অস্ত্র আধুনিক। তারপরও সবাই জানত—আজ এখানকার মাটি মুক্ত করতেই হবে।”

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পাক বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। থানার ওপরে উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা।
এই যুদ্ধের বড় বেদনাটি হলো চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ—যার একজন মাত্র এগারো বছরের শিশু। তাদের রক্তে মুক্ত হয় শিবচর। এই অপারেশনকে অনেক ইতিহাস গবেষক শিবচর অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন।