জুলাই আন্দোলনে আহত ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ন্যায়বিচারের দাবি
মো. শফিকুল ইসলাম (দুখু), হালুয়াঘাট প্রতিনিধিঃ
জুলাই বিপ্লবের উত্তাল সময়ে জাতীয় প্রেসক্লাব ও রাজপথে কলম হাতে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন দৈনিক মানবকণ্ঠের সংবাদকর্মী শফিকুল ইসলাম (দুখু)। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর সেই সাহসী অবস্থান আজ রূপ নিয়েছে নিজের জীবন বাঁচানোর এক কঠিন সংগ্রামে। হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন এবং জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করে চলছে আহত সাংবাদিক।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া সাংবাদিক মো.শফিকুল ইসলাম (দুখু) দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভুগছেন। একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বর্তমানে তিনি নাক ও ন্যাসোফ্যারিংসজনিত জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। একই সঙ্গে হামলার ঘটনার বিচার না পাওয়া এবং সরকারের দেওয়া বন্দোবস্তের জমি বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় তিনি ও তার পরিবার চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে তারা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। একদিকে ব্যয়বহুল চিকিৎসার চাপ, অন্যদিকে হামলার ঘটনায় আইনি অগ্রগতির অভাব। এছাড়া পরিকল্পিত হয়রানির উদ্দেশ্যে তাকে সরকার বন্দোবস্তের গর্ত জমির বসতভিটা বসবাসের অনুপযোগী করে দেওয়ায় পরিবারটি বর্তমানে চরম মানবিক সংকটে পড়েছে।
২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার। গত ৪ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল লিমিটেডের ২নং গেটের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন সে সময়ের দৈনিক গণজাগরণ পত্রিকার প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম (দুখু)। আন্দোলনের ২০ থেকে ৩০ জন দুর্বৃত্ত লাঠি, রড ও হকিস্টিক নিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে এবং হামলাকারীরা তার ব্যবহৃত ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
জুলাই আহত সাংবাদিক জানান, স্থানীয়রা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তার মাথায় ৭টি সেলাই দেন। ঘটনার প্রায় এক বছর পর, ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ তার নাক ও মুখ দিয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর তাকে পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, উত্তরা কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, ঢাকা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইএনএস) এবং ময়মনসিংহ ও ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি টানা প্রায় ছয় মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন।
আন্দোলনের হামলার অভিযোগের পরও দৃশ্যমান বিচার নেই, হামলার দিনই বিষয়টি শ্রীপুর থানায় রক্তাক্ত অবস্থায় গিয়ে অবহিত করা হয়। পরে ২৭ আগস্ট ক্যামেরা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। একজন তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী জুলাই আহত সাংবাদিক। পরবর্তীতে ৫ নভেম্বর শ্রীপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়। তার অভিযোগ, একাধিকবার যোগাযোগ করেও তদন্তে কার্যকর অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো সন্তোষজনক সাড়া পাননি সাংবাদিক।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে আহত হওয়ার পর থেকে তিনি জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং উন্নত চিকিৎসার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। অশ্রুসজল চোখে তিনি জানান, হামলার পর থেকে একাধিকবার তার নাক ও মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। দীর্ঘদিনের আঘাত ও সংক্রমণের কারণে বর্তমানে তার ইনফিরিয়র টারবিনেট ও বাম ন্যাসোফ্যারিংসে অস্বাভাবিকতা এবং স্কার টিস্যু অ্যাডহেশনসহ মাথার যন্ত্রণায় ভুগছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এসব আঘাতজনিত সমস্যার কারণে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, নাক বন্ধ থাকা, রক্তক্ষরণ এবং ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে। দ্রুত অস্ত্রোপচার ও উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন বলেও তারা মত দিয়েছেন। তিনি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ৭নং শাকুয়াই ইউনিয়নের বালিজুরী গ্রামের বাসিন্দা মো.শফিকুল ইসলাম (দুখু) সাত সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অসুস্থতার কারণে বর্তমানে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। এবং তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তানরা প্রতিদিন আল্লাহ্ তায়ালার কাছে তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে প্রার্থনা করছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ব্যয়ে তাদের প্রায় সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। তাই তারা সরকারের কাছে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
২০২৪ সালের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাহসিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করায় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে শফিকুল ইসলাম (দুখু)-কে ময়মনসিংহ বিভাগের (গ) ক্যাটাগরিতে ৩৭৬ নম্বর গেজেটভুক্ত “জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জুলাইয়ে আহত ও সাহসী সাংবাদিক হিসেবে সম্মাননা, সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর আইডিইবি মিলনায়তনে আগ্রাসন বিরোধী সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে “জুলাই বার্তাবীর” সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। বর্তমানে তিনি জাতীয় দৈনিক মানবকণ্ঠ-এর হালুয়াঘাট উপজেলা প্রতিনিধি এবং হালুয়াঘাট প্রেসক্লাবের কার্যকরী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে সরকার বন্দোবস্তের বাড়ি নির্মাণের জমিও বসবাসের অনুপযোগী সরকারের পক্ষ থেকে বন্দোবস্তের জমি পেলেও সেটি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জমিটি প্রায় ৫ ফুট গভীর গর্ত, বর্ষাকালে সেখানে পানি জমে থাকে এবং সেখানে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। ফলে বসতবাড়ি নির্মাণ তো দূরের কথা, সাধারণ চাষাবাদও সম্ভব নয়।
ভুক্তভোগীর সাংবাদিককের অভিযোগ, বাংলাদেশ সরকার বন্দোবস্ত জমিটি বসবাসের উপযোগী করতে ৫ ফুট গর্ত জমিটি ভরাট ও যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণের জন্য হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিকবার আবেদনসহ মৌখিকভাবে বলা হলেও এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই।
সাংবাদিক মো. শফিকুল ইসলাম (দুখু)-এর অসহায় পরিবার, স্থানীয় সাংবাদিক এবং সচেতন মহল তার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বন্দোবস্তের জমিটি দ্রুত বসবাসের উপযোগী করে দেওয়ার জন্যও তারা সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান। তাদের মতে, জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত একজন স্বীকৃত জুলাই যোদ্ধা সাংবাদিকের উন্নত চিকিৎসা, ন্যায়বিচার এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
মো. শফিকুল ইসলাম (দুখু), হালুয়াঘাট প্রতিনিধিঃ 






















